তসলিমা নাসরিন-এর হাতে হাতে পাথর


আমার নাম পরী কেন রেখেছিল আমার মা, সে মা-ই জানে। লোকে বলে, আমি নাকি পরীর মতো সুন্দরী। হয়তো ছিলাম জন্মের সময়, অথবা যখন ছোট। এখন সৌন্দর্যের তেমন কিছু অবশিষ্ট আছে বলে আমার মনে হয় না। গায়ের রঙ রোদে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। চুলের যত্ন না করে চুলও গেছে রুক্ষ হয়ে। ভালো কাপড় চোপড় বলতে নেই। সাধারণ কটি সুতি শাড়িই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরি। তারপরও লোকে বলে রূপের আগুন নাকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। মুখে কত রকম কিছু মাখে মেয়েরা। কী মাখতে হয়, কেন মাখতে হয় এসব জানিনা বলে মাখাও হয় না আমার। ঠোঁট শুকিয়ে চরচর করে। মা মাঝে মাঝে বলে ‘ঠোঁটে তেল টেল কিছু লাগা, ফাইটা তো রক্ত বারোচ্ছে।’ আমার সে সময় নেই। বাড়ির সবার জন্য রান্না করো, মশলা পেশো, উঠোন ঝাঁট দাও, ডাল পাতা জড়ো করো, পুকুরঘাটে কাপড় কাচতে যাও, কলসি করে খাবার পানি নিয়ে এসো, হাঁস মুরগিকে খাবার দাও, খোঁয়াড়ে ঢোকাও, গরুর দুধ দোয়াও, সব আমি। ভাবীরা বাচ্চাকাচ্চা সামলে যতটা পারে করে, দুব্বার মাও সাহায্য করে। কিন্তু অন্যরা ফাঁকি দিলেও আমার ফাঁকি দেওয়ার জো নেই। মা শয্যাশায়ী হওয়ার পর থেকে সংসার দেখার দায়িত্ব আমার ঘাড়েই পড়েছে। নিজের লোকদের চেয়ে আজকাল দুব্বার মা’র সঙ্গে সময় বেশি কাটে আমার। দুব্বার মা তিন বেলা খাবার পায়, আর মাস গেলে টাকা পায় হাতে। আমি তিন বেলা খাবার পাই, টাকা পয়সা কেউ আমার হাতে দেয় না। আমার তেল সাবান, শাড়ি ব্লাউজের পেছনেও আজকাল আর খরচ হয় না। ভাবীদের নতুন সাবান এলে, বা নতুন তেল শ্যাম্পু এলে পুরোনো সাবান আর তেল শ্যাম্পু আমাকে দিয়ে দেয়। শাড়ি ব্লাউজও পরতে পরতে মলিন হয়ে গেলে আমাকে দেয়। আমি এতেই খুশি। আমার জন্য কারও কোনও খরচ হোক, তা আমি চাই না। খরচের প্রশ্ন উঠলে আমার অস্তিত্বের দিকে নজর পড়বে, তখন আবার কী অঘটন ঘটে কে জানে।

অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন বাবার বয়সী একটি লোকের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দু’বছর পর লোকটি মারা যায়। তারপর থেকে আমি বাপের বাড়িতে। এ বাড়িতে আমার কাছের স্বজনরাই আমাকে বাড়তি লোক বলে মনে করে। তাই বাড়ির কাজ যতটুকু করা উচিত, তার চেয়ে বেশি করতে হয় আমাকে, আমি বাড়তি হলেও আমি যে প্রয়োজনীয় তা মনে করিয়ে দিতে হয়। আরও একটি কারণে আমি মনে করিয়ে দিই, আমাকে যেন আবার ধরে বেঁধে বিয়ে না দেওয়া হয়, অন্তত বাড়ির প্রয়োজনেই আমাকে যেন বাড়িতে রাখা হয়। দৌড়ে দৌড়ে বাড়ির এত কাজ করি বলেই শরীরে এক চিলতেও মেদ নেই। বয়স যে বাড়ছে, তারও খুব বেশি চিহ্ন নেই শরীরে। বাড়িতে বড় দুই ভাইয়ের বন্ধুরা, বাবার বন্ধুরা, চেনা-পরিচিতরা আসে, ভাবীদের বাপের বাড়ির আত্মীয়স্বজন আসে। আমার মুখোমুখি হলে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে, কেউ দূর থেকে দেখে, আড়চোখে দেখে, কিন্তু দেখে। আমি দ্রুত তাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাই। অনেকে বিশ্বাস করে আমি অপয়া, সে কারণে এই অপয়ার মুখ কেউ দেখুক, তা আমি চাইও না। কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই আমি জানি আমার ভবিষ্যত নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করবে, আমার ভাগ্য নিয়ে দুঃখ করবে।

উঠোন ঘিরে আমাদের অনেকগুলো চৌচালা দোচালা ঘর। বাপ-মায়ের ঘর, ভাইদের ঘর, রান্না ঘর, গোয়াল ঘর। একটি টালির চালের ছোট মাটির ঘর রান্নাঘরের পাশেই। সে ঘরটায় একসময় ধান চাল রাখা হতো। এখন আর হয় না। ঘরে একটিই চৌকি, সেটিতে আমি ঘুমোই, মেঝেয় বিছানা পেতে ঘুমোয় দুব্বার মা। ঘরে দুটো জানালা, একটি উঠোনের দিকে, আরেকটি গাছপালার দিকে। গাছের আড়ালে যখন ধবধবে চাঁদ ওঠে, আমি সারারাত জানালাটি খোলা রাখি। দুব্বার মা আমার জন্মের আগে থেকে এ বাড়িতে কাজ করে। আমার বিয়ের আগে এ বাড়িতে আমার কদর যা ছিল, বিধবা হয়ে ফেরত আসার পর সে কদর কমে তলানিতে পৌঁচেছে, সে দুব্বার মা আমার চেয়েও ভালো জানে। আগে সে আমাকে সমীহ করে কথা বলতো, এখন আর তা বলে না। মনিবের কন্যাকে যেটুকু ভয় পাওয়া দরকার, তার কিছুই পায় না সে। আমাকে সে তার নিজের গরিব কোনও স্বজনের মতো বা পুরোনো কোনও সখীর মতো মনে করে। দরকার মনে করলে শাসনও করে, ধমকে কথা বলে। পুকুরে বেশিক্ষণ সাঁতার কাটলে ‘ঠান্ডা লেগে গেলে সর্বনাশ হবে’ বলতে বলতে আমাকে টেনে ওঠায় পুকুর থেকে। চুলে জট বাঁধলে নিজেই চিরুনি নিয়ে এসে আঁচড়ে আঁচড়ে জট ছাড়িয়ে দেয়, চুলে তেল দিয়ে বিনুনি করে দেয়। আমাকে আপন মনে করে সে তার জীবনের সব কথাই খুলে বলে। আমি তার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি। কখনও তার কিশোরী বয়সে শোনা যাত্রা পালার গান শুনিয়ে আমাকে ঘুম পাড়ায়।

আমার বাবা কৃষক, ভাইরাও কৃষক। ভাইরা কৃষক হলেও আইএ বিএ পাশ করা কৃষক। জমি জিরেত যা আছে, তা এক কালে নিজেরাই চাষ করতো। ইদানীং বর্গা চাষীদের দিয়েছে। ধান কিছু বিক্রি হয়, কিছু কল থেকে ভাঙিয়ে নিয়ে আসা হয়। সবজির ক্ষেত আছে। কিছু ফলের গাছও আছে। সবারই খাওয়া পরা হয়ে যায়। প্রাচুর্য নেই। কিন্তু অভাবও নেই। বাড়িতে দুটোই সমস্যা। আমার বিধবা হওয়ার খবর পেয়ে মা’র এমনই এক অসুখ হয়, যে অসুখে শরীর তার অচল হয়ে গেছে। দ্বিতীয় সমস্যা আমি, আমাকে পার করার সমস্যা। বাড়ির সবারই আছে আমাকে পার করার ইচ্ছে, ইচ্ছে আবার নেইও। আমি কিন্তু পার হতে চাই না। কারণ যার সঙ্গে আমার গোপন একটি সম্পর্ক রয়েছে, সে বিবাহিত। আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীনই সে বিয়ে করেছে। নিজের পছন্দে বিয়ে করেনি, করেছে বাপ-ভাইদের পছন্দে। বিয়ের পর দিন থেকেই সে আমার কাছে আগের মতোই আসছে। গভীর রাতে ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে চলে আসে, দুব্বার মা ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে অন্ধকারে দরজার বাইরে বসে থাকে। শুধু তার বিড়ির আগুন জোনাকির মতো জ্বলে। দুব্বার মাকে দেখলে যে কেউ ভাববে, আমি ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে গিয়েছি, বিড়ি খেতে সে উঠে এসেছে। ঘরের ভেতর রঞ্জু তখন তার সমস্ত প্রেম ঢেলে দেয় আমার সর্বাঙ্গে। রঞ্জুকে চিনি মার্বেল খেলার বয়স থেকেই। গ্রামের বড়লোকের ছেলে। কলেজে এমবিএ পড়েছে। পড়াশুনো শেষ করে বাবার বাণিজ্য দেখছে। এই রঞ্জু আমার মতো অষ্টম শ্রেণী পাশ গরিব বিধবার সঙ্গে গোপন সম্পর্ক কেন রাখে ! রাখে, কারণ, রঞ্জু বলে, ওই মার্বেল খে্লতে খেলতেই নাকি মনে মনে সে ভালোবাসতো আমাকে। আমিও তো তাকে বাসতাম। বাবার বয়সী লোকটার সঙ্গে যখন বিয়ের কথা হচ্ছিল, তখন সন্ধ্যের পুকুরপাড়ে রঞ্জুর সঙ্গে দেখা করে বলেছিলাম, বিয়েটা বন্ধ করতে, বলেছিলাম চল পালিয়ে যাই। রঞ্জু শুধু আমার হাতটি ধরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়েছিল। আমাকে বিয়ে করার সাহস করেনি, আমাকে নিয়ে পালাবারও সাহস করেনি। অবশ্য এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সও তখন তার হয়নি।

বিধবা হয়ে বাড়ি ফেরার পর রঞ্জু আমার সঙ্গে দেখা করতে লাগলো সেই পুকুরপাড়ে, নির্জন কদম গাছের তলায়। তখন আমি ষোলো, রঞ্জু বাইশ। সেখানেই প্রথম সে চুমু খেয়েছিল আমাকে। আমাদের শরীর যে চাইতো পরস্পরকে সে আমরা দুজনই বুঝতাম। আমরা ধানক্ষেত- পাটক্ষেতের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতাম। কখনও কখনও আবার আমাদের বাড়িতেই কালো চাদর মুড়ে চলে আসতো। আমার ঘরটিতে নৈঃশব্দের হাত ধরে ঢুকে যেত। দুব্বার মা-ই একমাত্র সাক্ষী এর। কোনওদিন কাউকে বলেনি। বরং কারও পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলে সতর্ক করে দিত। রঞ্জুর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমার ধারণা ছিল রঞ্জু আমাকে ভুলে যাবে। দুব্বার মা আমার কানে কানে বলেছে,’ ভুলবো না’।
‘ তুমি কী কৈরা জানো যে ভুলবো না?’
‘আমি জানি। সে ঠিকই তোমার কাছে আসব।’
‘ কেন আসব?’
‘ তুমি হইলা ডানা কাটা পরী। তুমি হইলা ঝিনুকের মুক্তা। এমন সম্পদ সে ছাইড়া দিব না।’
‘ কী যে কও তুমি দুব্বার মা। এই দুনিয়ায় আমি নিঃস্ব। এতিম না হইয়াও এতিম।’
দুব্বার মা ঠিকই বলেছে, রঞ্জু ঠিকই এসেছে। সম্ভবত বিয়েটা করতে হয় বলে করেছে। কিন্তু মন আমার কাছেই পড়ে থাকে। আমাকে চুমু খেতে খেতে বলে, ‘তোরে নিয়া একদিন পালাইয়া যাবো আমি। দূরের কোনও দ্বীপে গিয়া ঘর বাঁধবো। সুগন্ধী গ্রামের কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না। যাবি তো আমার সাথে? ‘ রঞ্জু আমার সারা শরীর সুখে ভরিয়ে দিতে থাকে, আর আমি অস্ফুট স্বরে বলতে থাকি, ‘ যাবো যাবো যাবো।’
জীবনে এক পুরুষকেই ভালোবেসেছি, এক পুরুষকেই আপন করে পেয়েছি। রঞ্জু আমার সঙ্গে পুকুরঘাটে, কদমতলায়, মাঠে মেলায়, ঘরে বাইরে যেখানেই দেখা করে, প্রায়ই হাতে একখানা করে চিঠি গুঁজে দেয়। আমি তার প্রথম ভালোবাসা, আমাকে সে চিরকাল ভালোবাসবে। তার বিয়ের আগের চিঠিগুলোয় লিখতো, আমাকে সে বিয়ে করবে, বিয়েতে পরিবারের লোকেরা আপত্তি করলে আমাকে নিয়ে সে পালিয়ে যাবে। দুব্বার মা’কে সেসব চিঠি পড়ে শোনাতাম। দুব্বার মা বলতো,’বিয়াটা আগে করতে কও, তারপর অন্য কিছু।’ দুব্বার মা’কে বলতাম, ‘ বিয়াতে তো ওর বাবা রাজি না। ওরা কী আর আমি কী, কও! ওরা আকাশে আর আমি পাতালে! রঞ্জুর হাতে কলেজের ডিগ্রি। আমি তো ইস্কুল পাশই করি নাই। ওরা বড়লোক, আমরা গরিব।’ দুব্বার মা মাথা নেড়ে বলতো, ‘প্রেম ভালোবাসা গরিব বড়লোক দেখে না, ইস্কুল কলেজ দেখে না। দেখলে সে সম্পর্ক সম্বন্ধের সম্পর্ক হইতো, প্রেম ভালোবাসা হইতো না। প্রেম ভালোবাসা গুলারে অন্ধ হইতে হয়, তা না হইলে প্রেম ভালোবাসা হয় না।’

রঞ্জুকে দুব্বার মা’র কথাগুলো বলেছিলাম, বলেছিল সে বিশ্বাস করে এর প্রতিটি অক্ষর , সে কারণে আমাকে নিয়ে পালাতে চায়। সুগন্ধী গ্রাম, রঞ্জু বলে, দিন দিন দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে। টাকা পয়সার পেছনে সবাই ছুটছে। লোকেরা অসৎ, দুর্নীতি করতে দ্বিধা করে না, হাসতে হাসতে লোক ঠকায়, এমনকী তার বাবাও। তাই বাবাকে ছেড়ে যেতে চায় সে। আমি নাকি এক মূর্তিমান সরলতা, তাই আমার পায়ে চুমু খায় সে, আমি নাকি আপাদমস্তক পবিত্র, তাই আমাকেই সে তার শরীর মন সমর্পন করেছে। বিয়ে করার পর বলেছে, তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে তার পরিবারের লোকেরা। বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে যে মেয়েটি, তার জন্য তার মায়া হয়, মেয়েটি তার ভালোবাসা পাচ্ছে না, মেয়েটিকে সে স্পর্শ পর্যন্ত করছে না, কিন্তু সোনার গয়নায় শরীর মুড়েই সে সুখী। তাকে সুখে থাকতে দিয়ে আমার কাছে রঞ্জু আসে নিজেকে সুখী করতে। সে পালিয়ে যেতে চায় আমাকে নিয়ে। দুব্বার মা’কে ফিসফিস করে বলি রঞ্জুর পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছের কথা। দুব্বার মা বলে, ‘ পালাইয়া যাইতে তো সে কয়েক বছর ধইরা চাইতেছে, পালায় না কেন? এখন বিয়া করার পর আবার যখন তোমারে নিয়া পালাইতে চায় , পালাক। দেরি করে কেন? পালাইব পালাইব করলেই কি শুধু চলবে, পালাইতে তো হবে। বাধা তারে তো কেউ দিতাছে না।’

পালাচ্ছে না বলে আমি রঞ্জুকে দোষ দিই না। বিয়ে করে যদি আমাকে সোনার গয়নায় মুড়িয়ে সে অন্য কোথাও সুখ আহরণে চলে যায়, তাহলে কী লাভ! তার চেয়ে এই ভালো, সোনার গয়না নেই, কাতান শাড়ি নেই, এলোমেলো মলিন শাড়ি পরা আমার কাছেই রঞ্জু বার বার আসে, আমাকেই পেতে চায়। রঞ্জু দু’বার আমাকে গর্ভবতী করেছে। প্রথমবার জরায়ুতে শেকড় ঢুকিয়ে গভীর রাতে গোপনে গর্ভপাত করিয়ে দিয়েছে দুব্বার মা। জ্বরে ভুগেছিলাম সাতদিন। সাতদিন ঘরেই শুয়ে শুয়ে কাতরেছি। আমার জন্য ডাক্তার বৈদ্য ডাকা হয়নি। একদিক থেকে ভালো। সংসারে কেউ অবহেলিত হলে এই সুবিধেটা পাওয়া যায়। সে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, সে ঘরে ফিরলো কিনা, ঘুমোলো কি না, কার সঙ্গে ঘুমোলো, মনে তার কোন বাতাস বইছে, কাকে ভাবছে, কার সঙ্গে দেখা করছে, জ্বরটাই বা কী করে বাঁধালো, এসব খবর কেউ রাখে না। দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হলাম রঞ্জুর বিয়ের পর। রঞ্জুকে জানাই না। শুধু দুব্বার মা’কে জানাই। দুব্বার মা শুনে হু হু করে কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে, ‘এতবার গর্ভ নষ্ট করা ভালো না গো বাচ্চু।’

দুব্বার মা আমাকে বাচ্চু বলে ডাকে। আমাকে সে জন্মাতে দেখেছে। মা’র আঁতুড় ঘরে সে ছিল। আমাকে প্রথম কোলে নিয়েছিল দুব্বার মা’ই। বাচ্চা বলে ডাকতে ডাকতে আদর করে এক সময় বাচ্চু বলে ডাকতে শুরু করেছে। সেই থেকে বাচ্চুই ডাকে। সে নাকি এবার রঞ্জুর বাড়িতে গিয়ে তার মা’কে জানাবে যে আমার পেটে রঞ্জুর বাচ্চা। আমি দুব্বার মা’কে হাতে পায়ে ধরে থামাই। এরপর দুদিন বিষণ্ণ থেকে কোথাও গিয়ে আগের মতো শেকড় এনেছে। আমি তাকে গর্ভপাত করতে দিই না। আমি জানিনা কেন, আমার খুব মা হতে ইচ্ছে করে, রঞ্জুর সন্তানের মা। এটি বিয়ের সন্তান নয়, কিন্তু এটি ভালোবাসার সন্তান। দুব্বার মা’কে বোঝাবার চেষ্টা করি যে বিয়ের সন্তানও এত পবিত্র নয়, ভালোবাসার সন্তান যত পবিত্র।

এরপর রঞ্জু এলে ফিসফিস করে দুব্বার মা’ই তাকে বলে, ‘বাচ্চুরে যদি বিয়া করতে না পারো, তাহলে পালাও ওরে নিয়া। ওর তো আবার বাচ্চা পেটে। একবার বাচ্চা নষ্ট করছি। আমি আর নষ্ট করতে পারবো না। মেয়েটা মরবে। ওরে বাঁচাও।’ রঞ্জু এরপর অপরাধীর মতো আমার পায়ের কাছে মাথা নুয়ে বসে থাকে। অনেকক্ষণ পর আমার পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘এরে নষ্ট করতে হবে না, আমারে এক সপ্তা সময় দে পরী, আমি তরে নিয়া চলে যাবো সুগন্ধী থেকে। আমার বাড়ি ঘর বাপ মা চাই না, আমার ঘর সংসার চাই না, আমার তরে চাই পরী। তরে ছাড়া আমি বাঁচব না’।

সেই যে গেছে রঞ্জু , দু সপ্তাহ গেছে, চার সপ্তাহ গেছে, ফিরে আসেনি। আমি যখন বমি করে করে ঘর ভাসাচ্ছি, এমন সময় একদিন দুব্বার মা খবর নিয়ে এল, রঞ্জুদের বাড়িতে গ্রামের লোককে নেমন্তন্ন করা হয়েছে, সামিয়ানা টাঙিয়ে লোক খাওয়ানো হচ্ছে, রঞ্জুর বউয়ের বাচ্চা হবে। দিনের পর দিন আমি কী কারণে অসুস্থ থাকছি, প্রথম দিকে কেউ বুঝতে না পারলেও, ভাবীরা একদিন বোঝে। পাঁচ মাসের পেটকে তো শাড়ি দিয়ে বেশিদিন আড়াল করা যায় না। দুব্বার মা বলেছিল তার সঙ্গেই যেন অন্য গ্রামে চলে যাই। আমি রাজি হইনি। একা হাতে বাড়ির কাজ শেষ করে এসে দুব্বার মা বসে আমার শিয়রের কাছে। গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে –’ তোমার বাপ ভাইরা জানলে তোমারে কুপাইয়া মাইরা ফেলব বাচ্চু’।
ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে দুব্বার মা।
আমি বলি, ‘মারুক। আমি তো মরার মতোই। রঞ্জু আমারে প্রাণ দিত, সেই রঞ্জু যখন আর নাই, তখন কী আশায় আর বাঁচব, কও তো!’
‘তোমার মা অচল। সে আদ্ধেক কথা বোঝে, আদ্ধেক বোঝে না। ভাবীরা না থাকার মতোই। ভাবীরা কোনওদিন আপন হয় না।’
‘এই দুনিয়াতে তুমিই আমার আপন লোক দুব্বার মা। তোমারও কিছু নাই, আমারও কিছু নাই। অন্য গ্রামে যাইতে পারি। কী নাম যেন সেই গ্রামের! পলাশপুর! কিন্তু কেউ আমাদের শান্তি দিবে না। গ্রাম আলাদা হইলে কী হবে, মানুষ তো সব একই।‘


বাড়ির কেউ কাউকে কিছু বলে না, কিন্তু সারা গ্রামে না হলেও অর্ধেক গ্রামে হই রই করে প্রচার হয়ে যায় যে আবদুর রহিমের বিধবা কন্যা পরীর পেটে বাচ্চা। লোকে ছিঃ ছিঃ করতে লাগলো। কার বাচ্চা পরীর পেটে, সে নিয়েও গভীর জল্পনা কল্পনা চলছে। রঞ্জুকে এ বাড়ি থেকে একবার বেরোতে দেখেছিল বড় ভাই। ভেবেছিল বাবার কাছে বা ছোট ভাইয়ের কাছে সে হয়তো কাজে এসেছিল, ছোট ভাবীর যে আত্মীয়কে রঞ্জু জানে, সেই আত্মীয়র বাড়ি থেকে হয়তো জরুরি কোনও খবর নিয়ে এসেছিল! রঞ্জু কার কাছে এসেছিল সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে বড় ভাই। দুব্বার মা’কেও জিজ্ঞেস করেছে। সজোরে মাথা নেড়ে সে বলেছে, সে রঞ্জু বা রঞ্জুর মতো দেখতে কাউকে বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখেনি। আমাকে কেউ প্রশ্ন করেনি। সম্ভবত আমি এমনই অপাংক্তেয়, এমনই অচ্ছুৎ যে আমার সঙ্গে দেখা করতে কোনও ভদ্রলোক, বিশেষ করে শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত কেউ এ বাড়িতে পা রাখতে পারে , এ কেউ ধারণাও করতে পারে না। এক সন্ধ্যেয় কদমগাছের তলায় বড় ভাইয়ের বন্ধু কুদ্দুস দেখে ফেলেছিল আমাকে আর রঞ্জুকে, সেদিন সে খবরটি দ্রুত বড় ভাইকে দেয়, বড় ভাই সেদিন নিশ্চিত হয়েছে, রঞ্জু আমার কাছেই আসে। যে কোনও কারণেই হোক বড় ভাই চেপে গিয়েছিল খবরটি।

গর্ভবতী আমি কার দ্বারা হলাম, সেটি বড় ভাই আর তার বন্ধু কুদ্দুস তো অনুমান করতে পেরেছেই। সম্ভবত কুদ্দুসই রাষ্ট্র করে দিয়েছে যে আমার পেটে রঞ্জুর বাচ্চা। এসব খবর বাইরে থেকে আমাকে দুব্বার মা’ই এনে দেয়। বাজারের গুঞ্জন মেম্বারের কানে যায়। বড় ভাইয়ের কানেও যায়। মেম্বারকে ধরে বাজারে একটি দোকান নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। উল্টে মেম্বার তাকে ভৎসর্না করলো। বললো, ‘কেমন ঘরের লোক আপনি, বোন ব্যাভিচার করে বেড়ায় আর আপনাদের কোনও খবরই নাই!’ বড় ভাইয়ের দিকে বাজারের লোকেরা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলো। বাড়িতে এসে বড় ভাই আমাকে ঘর থেকে বের করে এমন মারলো, যে গাছের যত ডাল পড়ে ছিল উঠোনে, আমার পিঠে ভাঙতে বাকি রাখেনি। দুব্বার মা নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করে আমাকে কিছুটা রক্ষা করেছে। পিঠ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাক, আমি কিন্তু রক্ষা করতে চেয়েছি পেটের রঞ্জুকে।

বাাজারের গুঞ্জন প্রবল বেগে ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা সময় নেয় না। বাড়ির লোকেরা বাড়ির খবর বাজার থেকে নিয়ে আসে। বাবাও চুলের মুঠি ধরে আমাকে উঠোনে ফেলে পেটালো। ছোট ভাইও একই কাজ করলো। ভাবীরা দূর থেকে দেখলো। তাদের চার চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছিল ঘৃণা। কেবল দুব্বার মা’ই কেঁদে পড়লো। অচিরে সারা গ্রাম জেনে গেল যে আবদুর রহিমের বিধবা কন্যা পরী বড়লোকের ছেলে বিবাহিত রঞ্জুর ওপর ভর করেছে, তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিপথে নিয়েছে। রঞ্জুর সংসারে আমি আগুন লাগিয়েছি, সুতরাং আমার শাস্তি প্রাপ্য।

ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দুব্বার মা আমাকে এক রাতে জানালো যে গ্রামের বড় বড় লোকেরা আসছে, সালিশ বসবে আমাদের বাড়িতে। সালিশে সাব্যস্ত হবে কী শাস্তি আমার প্রাপ্য। এখনও সময় আছে, আমি যেন গর্ভপাত করি। আমি তারপরও রাজি হই না। এই সন্তানটিই রঞ্জুর স্মৃতি হিসেবে আমার সঙ্গে থেকে যাবে, আমি একে কিছুতেই হারাতে চাই না। দুব্বার মা’র হাতে চিঠি দিই রঞ্জুকে দেওয়ার জন্য। দুব্বার মা চিঠি নিয়ে যায় বটে, কিন্তু রঞ্জুর হাতে চিঠি দেওয়া সম্ভব হয় না। চিঠি আঁচলে যেমন বাঁধা ছিল, তেমন বাঁধাই থাকে। আবারও নতুন চিঠি দিই। সে চিঠিও রঞ্জুর হাতে পৌঁছোয় না।

উঠোনে কয়েকটি চেয়ার পেতে দেওয়া হয় সালিশের দিন। সালিশে প্রচুর লোক জড়ো হয়। উঠোন উপচে পড়ে, ভিড় বড় রাস্তা অবধি চলে যায়। সুগন্ধী গ্রামের মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার হুজুর, পানিপড়া পীর, পার্টির নেতা, মেম্বার, বাজার কমিটির প্রধান চেয়ারে বসে। এত গণ্যমান্য লোক আমাদের বাড়িতে আগে কোনওদিন পদধূলি দেয়নি। সালিশে আসা অনেককে আমি চিনতে পারি, যারা আমাকে দেখে লোভের জিভ চেটেছিল, লোমশ হাত বাড়িয়েছিল, সেই ইমাম, সেই হুজুর, সেই মেম্বার। কেউ এতকাল আমার নাগাল পায়নি। আজ তারা চাইলেই আমাকে পিষে ফেলতে পারে। আমি মাথা নত করে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়াই। আমার বাবা মাথায় হাত দিয়ে পীরের পায়ের কাছে বসে থাকে। ভাইরা দাঁড়িয়ে। ভাবীরা ঘরের দরজা থেকে দেখছে। শুধু দুব্বার মা আমার সবচেয়ে কাছে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। একজন বললো, আমি অন্যায় করেছি, গ্রামের গৌরব যে ছেলে, সেই হীরের টুকরো রঞ্জুকে আমি অসৎ উদ্দেশ্যে কাছে টেনেছি। আমি বেহায়া, বেশরম, আমি রাক্ষুসী, আমি ডাইনি। আরেকজন বললো, বিধবা মেয়ের পেটে বাচ্চা কী করে আসে। অবৈধ এবং অনৈসলামিক সম্পর্কের জন্য, ঘৃণ্যতম ব্যভিচারের জন্য আমাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হবে। আগামী বাদ জুম্মাহ এই শাস্তি দিতে গ্রামের সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়।

সালিশের পর ঘরে নিয়ে আমাকে শুইয়ে দেয় দুব্বার মা। আমার কাছে ভাই ভাবীরা কেউ আসে না। সচল বাবাও আসে না। অচল মা আসতে পারে না বলেই হয়তো আসে না। এ সময় একমাত্র রঞ্জুই আমাকে বাঁচাতে পারে। রঞ্জুই এসে বলতে পারে, ‘ পরীর কোনও দোষ নাই, দোষ আমার। পরীকে আমি ভালোবাসি, পরীকে নিয়া আমি দূরে কোথাও চলে যাব, পরী আমার বাচ্চার মা হবে।’ অথবা বলতে পারে, ‘পরীকে আমি বিয়ে করবো, তোমরা বরং একটা কাজি ডেকে নিয়ে আসো’। রঞ্জু এতকাল ভালোবাসে আমাকে, এইটুকু সে কি করবে না? নিশ্চয়ই সে শুনেছে সালিশের কথা, সালিশের বর্বর বিচার। দুব্বার মা’কে জিজ্ঞেস করি, ‘রঞ্জু এখনও আসছে না কেন?’
দুব্বার মা আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে সে রঞ্জুর বাড়িতে গিয়ে সালিশে কী হলো তা চিৎকার করে শুনিয়ে আসে। তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় বাড়ির লেঠেলরা।


সালিশের দিন সবাই ছিল, শুধু দুব্বার মা’ই ছিল না। সে ভোরে উঠেই এ বাড়ি ছেড়ে, এ গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। পলাশপুর গ্রামে, যে গ্রামে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, সেই গ্রামেই একটি ঘর তুলে বাকি জীবন থেকে যাবে। পুতুল খেলার বয়সে বিয়ে হয়েছিল, সাপের কামড়ে স্বামী মারা গেছে। কোনও সন্তান নেই দুব্বার মায়ের। তারপরও লোকেরা তাকে দুব্বার মা বলে ডাকে। কেন ডাকে, সে আজও জানে না। আমি তাকে যেতে দিয়েছি। কারণ আমাকে লক্ষ্য করে লোকের পাথর ছোঁড়া দুব্বার মা সহ্য করতে পারবে না। আমাকে যেহেতু সে রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে থেকে কী দরকার শুধু শুধু দুঃখ পেয়ে! রঞ্জু বলতো আমি তাকে যত ভালোবাসি, তার চেয়ে বেশি সে আমাকে বাসে। আজ অন্তত আমি দেখাতে পারবো, সে আমাকে যতটা বাসে, তার চেয়ে আমি তাকে বেশি ভালোবাসতাম, বেশি বাসি।

বাবা মা, ভাই ভাবী কাউকে অনুরোধ করিনি আমাকে রক্ষা করার জন্য। কারও কাছে কাঁদিনি। যদি ভালোবাসা অপরাধ, তবে অপরাধের শাস্তি সানন্দেই গ্রহণ করবো। সকালেই সালিশের লোকেরা এসে উঠোনে একটি গর্ত খুঁড়েছে। দশটার মধ্যেই উঠোন ভরে গেল লোকে। যেন পুরো গ্রাম উঠে এসেছে এই উঠোনে। সবাই দেখবে পরী নামের এক পঁচিশ বছরের তরুণীকে কিভাবে হত্যা করা হয়। আমার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছি দুব্বার মা চলে যাওয়ার পর থেকে। শুয়ে শুয়েই জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি মানুষ কী করে ভিড় করছে। ইমাম, পীর, হুজুর, মেম্বার সকলে চলে এসেছে। ভরা উঠোনে আমার খোঁজ করে ইমাম । খুব ভোরবেলায় স্নান করে আমি শুধু শাড়ি পেঁচিয়ে রেখেছি শরীরে, ব্লাউজ পরিনি। ভেজা চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। উঠোনের হট্টগোলের মধ্যে হঠাৎ দরজায় খটখট। দুব্বার মা চলে গেছে তারপরও মনে হয় দুব্বার মা’ই বোধহয় ফিরে এসেছে। আমাকে নিয়ে পলাশপুরে যাবে বলে ফিরে এসেছে। দ্রুত দরজা খুলে দেখি ইমাম। মুখে মেহেদি রঙের দাড়ি, মাথায় সাদা টুপি, চোখে সুরমা। বাঁ চোখটি হাসছে। আমার দু’হাত শক্ত করে পেছন থেকে ধরে ঠেলতে লাগলো উঠোনের দিকে। উঠোনের গর্তের দিকে। জানি না কত জোড়া চোখ আমাকে দেখে। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে একাই হেঁটে যাই । নিজেই গর্তে নেমে পড়ি। কোমর পর্যন্ত শরীর ডুবে গেল গর্তে। হঠাৎ উল্লাস ধ্বনি শুরু হয়ে যায় দর্শকদের মধ্যে। কয়েক বস্তা পাথর ফেলে রাখা হয়েছে উঠোনে। লোকেরা যেন সেসব পাথর ছোঁড়ে আমার শরীরে। সত্যিই পাথর এসে পড়ছে আমার শরীরে। আমার মাথায়, মুখে, বুকে, পেটে, পিঠে। যেন শিলাবৃষ্টি হচ্ছে, বিশাল বিশাল শিলা পড়ছে শরীরে। শাড়ি ভিজে যাচ্ছে রক্তে। ভিজে শাড়ি লেপ্টে থাকে শরীরে। এক টানে রক্তে ভেজা শাড়িটি খুলে দলামোচা করে পেটের ওপর ধরে রাখলাম, যেন পেটের ভেতর যে প্রাণ ধুকপুক করছে, সেটি বাঁচে। সেটির গায়ে যেন পাথর না লাগে। শাড়ি খোলার সঙ্গে সঙ্গে বীভৎস আদিম আওয়াজে উঠোন প্রকম্পিত হলো, অনেকক্ষণ পর্যন্ত সেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি হতে লাগলো। এক সময় বাঁচার ইচ্ছে এত তীব্র হয়ে ওঠে আমার যে আমি গর্ত থেকে উঠে দৌড়োতে থাকি, উঠোন ঘিরে আছে লোকে, পালাবার পথ নেই। জানিনা কে বা কারা আমাকে খপ করে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিল গর্তটিতে। তখন ঘন ঘন আরও পাথরের আঘাত পড়ে বুকে মুখে। আমি উপুড় হয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাই। চিৎকার করতে থাকি ‘বাজানগো, আমারে বাঁচাও, ভাইজানগো বাঁচাও আমারে।’ কেউ আসে না বাঁচাতে। একবার শুধু চোখ খুলে দেখতে চাই, কারা পাথর ছুঁড়ছে, কাউকে আমি চিনি কিনা। ভিড়ের মধ্যে দেখি রঞ্জু। রঞ্জুর হাতে পাথর। সেও আমার দিকে পাথর ছুঁড়ছে। আমার বিশ্বাস হতে চায় না মানুষটা রঞ্জু। আমি চোখ কচলে আবার তাকাই। দেখি রঞ্জুই। মাথায় পাথর লেগে যখন ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে, আমি অস্ফুট কন্ঠে শুধু বলতে থাকি, ‘ রঞ্জু তুমি না আসলেও পারতা, এইখানে তুমি না আসলেও পারতা রঞ্জু।’ আমার মাথা ঢলে পড়ে। মিহি কান্নার শব্দ ভেসে আসে বাড়ির ভেতর থেকে, মা’র কান্নার শব্দ। দূরের গ্রামে পৌঁছে দুব্বার মা’ও বোধ হয় এমন মিহি সুরে কাঁদছে।

-তসলিমা নাসরিন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »