আলোর মতো অন্ধকার তসলিমা নাসরিন

আলোর মতো অন্ধকার তসলিমা নাসরিন

আমার নাম দেবিকা, দেবিকা স্মিথ। নাম শুনে অনেকে অবাক হয়। বলে, স্মিথ বুঝলাম কিন্তু দেবিকা ব্যাপারটি কী? আমার সোনালী চুল, সাদা ত্বক দেখে তাদের হয়তো মনে হয় আমার নাম মার্গারেট, এলিজাবেথ, স্টেলা, এভ্লিন, শারলট হলে মানাতো। আসলে আমার জন্মের পর যে নামটি আমাকে দেওয়া হয়েছিল, সেটি মার্গারেট। আমি ছিলাম মার্গারেট স্মিথ। মার্গারেট স্মিথ কী কারণে দেবিকা স্মিথ হয়ে উঠলো, সে এক ইতিহাস। সেই ইতিহাস আমি যাকে তাকে বলিনা। কেউ খুব চেপে ধরলে বলি, ‘আমার বাবা মা ভারতে ছিলেন কিছুদিন।’ তথ্য ভুল নয়। কিন্তু বাবা মা ভারতে কিছুদিন বাস করলে মার্গারেট নাম বদলে কী কারণে দেবিকা রাখবেন, সে প্রশ্ন কেউ করে না, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও আমার পড়ে না। আসলে বাবা মা কিছুদিন নয় , ভারতে ছিলেন পাঁচ বছর।

নটিং হিলের একটি ইস্কুলে আমি জীববিজ্ঞান পড়াই। ছোট শহরের স্কুল শিক্ষিকাদের জীবনের মতোই নিস্তরঙ্গ জীবন আমার। হাতে গোনা ক’জন সহকর্মীর সঙ্গে বেশ ভাব, বাকিদের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটা কী খবর ভালো পর্যন্ত। ভাব যাদের সঙ্গে বেশি, তাদের সঙ্গে মাঝে মধ্যে কোনও রেস্তোরাঁয় বা বাড়িতে মিলিত হই, গল্প গুজব আর পানাহারে সন্ধ্যে কাটাই। ইস্কুলের ট্যুরে, বা কিছু কিছু অনুষ্ঠানে বছরে ছ’সাতবার বাইরে যেতে হয়। তা না হলে নিজের সাজানো গোছানো ঘরেই সময় মন্দ কাটে না। থাকি লণ্ডনের পশ্চিমে, নিজের কেনা
অ্যাপার্টমেন্টে। বিয়ে করিনি। ইস্কুলের বেশ কয়েকজন শিক্ষিকা বিয়ের ঝামেলায় যায়নি। সে কারণে আমার হাল একেবারেই হংস মাঝে বক যথা নয়। বিয়ে যারা করেনি, তাদের নানা গল্প। আমার গল্প ওদের সঙ্গে মেলে না। আমি প্রায় সবার গল্পই শুনেছি, একজন একের পর এক প্রেমিক দ্বারা প্রতারিত, আরেকজন লেসবিয়ান, আরেকজনের পুরুষে বিশ্বাস নেই, আরেকজন বিয়ে করেছিল, কিন্তু ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর টের পেয়েছে বিয়ে ব্যাপারটা কোনও চমৎকার কিছু নয়। আমার গল্প বলতে গেলে বহু বছর পেছনে যেতে হবে।
সালটা ছিল উনিশ’শ চুয়াত্তর। আমার প্রকৌশলী বাবাকে তাঁর বন্ধু রবার্ট ম্যাক্সোয়েল চিঠি লিখে জানালেন তিনি নাকি ভারতের পুনে’য় জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। বাবাকে তিনি আমন্ত্রণ জানালেন পুনেয়। বাবা যেন অন্তত দু’দিনের জন্য হলেও ঘুরে যান। বাবা তখন লণ্ডনে তাঁর ফার্ম নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ত। চারদিকে তাঁর নাম ডাক । প্রায় একশ’ জন নির্মাণ-প্রকৌশলী কাজ করছেন তাঁর ফার্মে। লন্ডন, গ্রিনিচ, উইম্বল্ডন, রিচমণ্ড, ওয়েম্বলিতে ডিজাইন এবং গৃহ নির্মাণের প্রকল্প চলছে। শীঘ্র বার্মিহাম, ম্যানচেস্টার, এডিনবরার কাজ হাতে নেবেন। এমন সময় হঠাৎ একদিন তিনি পুরো পরিবার নিয়ে ভারতে চললেন।
বাবা যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে এত ব্যাকুল ছিলেন আমরা জানতাম না। ইম্পেরিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মালিক, অঢেল টাকা পয়সা, বিশাল একখানা বাড়ি কিনেছেন শহরে, ছেলেমেয়েকে দামি ইস্কুলে ভর্তি করিয়েছেন, মার্সিডিজ গাড়ি কিনেছেন একখানা, আর একখানা শখের রোলস রয়েস। জীবনের এত সাফল্যও যে বাবাকে জীবনের অর্থ দেয়নি, তা মা-ও জানতেন না। মা ছিলেন স্থপতি , বাবার ফার্মে কাজ করতেন। বাবা আর মা দুজনেরই স্বপ্ন ছিল একটি ফার্ম গড়ে তোলার, ওটি যে কয়েক বছরের মধ্যেই এমন চমৎকার দাঁড়িয়ে যাবে, দুজনের কেউ আশাও করেননি। সাত বছর প্রেম করার পর বিয়ে করেছেন দুজন। শুনেছি বিয়েতে নাকি প্রিন্স চার্লস এসেছিলেন। শুধু শুনেছি বলি কেন, এ্যালবামে ছবিও দেখেছি।
আমার বয়স তখন দশ। অলিভারের সাত। আমরা পুনেয় ভগবান রজনিশ নামের এক সন্ন্যাসী গুরুর আশ্রমে উঠলাম। আশ্রম বলে কিছু যে কোথাও আছে তা আমার জানা ছিল না। আশ্রমে সকলে কমলা রঙের কাপড় পরে থাকেন। গলায় তাঁদের রুদ্রাক্ষের মালা, মালায় রজনিশের ছবি লাগানো লকেট। যেন বড়দের কোনও ইস্কুলের ইউনিফর্ম ওটি। সবাই ক্লাসের ফাঁকে ঘোরাফেরা করছেন। কেউই বিষন্ন নন, সবারই সর্বাঙ্গে আনন্দ। যেন পরীক্ষায় সবাই একশোয় একশো পেয়েছেন। রজনিশ দৃশ্যমান হতেই সবার চোখ মুখ থেকে মুগ্ধতা ছিটকে পড়তে থাকে। দুটো হাত জড়ো করে যে যেখানে আছেন স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন। যেদিন আমরা পুনেয় প্রথম এসেছিলাম, , সেদিনই রবার্ট ম্যাক্সোয়েল রজনিশের ঘরে আমাদের নিয়ে ঢুকেছিলেন। বাবা মা’র কপালে তখন কুঞ্চন, চোখ চঞ্চল।
সবাইকে হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে রজনিশের সামনে বসতে হলো। রজনিশ লোকটির গা বাদামি রঙের, মাথায় মস্ত টাক, ঠোঁটের কোণে অমীমাংসিত এক টুকরো হাসি। আমাদের মাথায় এক এক করে তিনি হাত রাখলেন, আর একেকজনের চোখের দিকে বড় বড় চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। যখন বেরিয়ে এলাম, বাবা আর মা’র কপাল থেকে কুঞ্চন সরে গেছে, চোখ শান্ত, ঠোঁটে খুশি উপচে পড়ছে। আমি আর অলিভারই ছিলাম আগের মতোই। আমাদের কিছুর বদল হয়নি। বাবা আর মা’কে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখলাম। আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমাকে দেখতে পান না, অলিভারকে দেখেও কোলে তুলে নেন না। আমরা আশ্রমের মাটিতে গড়াগড়ি করি, বন বাদাড়ে ছুটে বেড়াই, পুকুরে ডুবে থেকে জ্বর সর্দি বাধিয়ে বসি। বাবা মা কিছু বলেন না। খেলতে খেলতে দৌড়োতে দৌড়োতে রাস্তায় চলে যাই, ছোট রাস্তা থেকে বড় রাস্তায়, বড় রাস্তা থেকে আরও বড় রাস্তায়, কেউ আমাদের খবর রাখে না। এত অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা আমরা জীবনে কখনও পাবো বলে স্বপ্নেও ভাবিনি।
আশ্রমের ভেতর ইউরোপ আমেরিকা থেকে আসা লোকই বেশি। তাঁদের ছেলেমেয়েরা দু’দিনেই আমার আর অলিভারের বন্ধু হয়ে গেল। লক্ষ্য করলাম বাবা মা’র সঙ্গে প্রথম কয়েকদিন রাখার পর বাচ্চাদের আলাদা করে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের জন্য আলাদা বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওতেই তারা বাবা-মা’র সান্নিধ্য ছাড়া বড় হতে থাকে। অলিভার দু’দিন মা মা করে কেঁদেছে, তারপর ফরাসি এক বাচ্চা-মেয়ে তার বন্ধু হয়ে যাওয়ার পর কান্না থামিয়েছে। শুধু আমাদের নয়, বাবা মাকেও আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। রজনিশ বিয়েয় বিশ্বাস করেন না, সুতরাং বিবাহিত দম্পতিদের একত্রবাস নিষিদ্ধ।
মা’কে দেখি কমলা রঙের পোশাক পরে অচেনা নারী পুরুষের সঙ্গে গল্প করছেন, বাবাকেও দেখি একই পোশাক পরে অচেনা নারী পুরুষের সঙ্গে হাসি তামাশায় মেতে আছেন। বাচ্চাদের দেখভাল করছেন বড়রা, আমাদের শরীরেও পরিয়ে দিয়েছেন কমলা কাপড়, আমরা কী খাবো, কোথায় শোবো তাঁরাই ঠিক করে দিচ্ছেন। এই বড়দের মধ্যে বাবা মা নেই। বরং বাবা মাকে দেখি সঙ্গীসাথী নিয়ে জঙ্গল কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছেন। বাচ্চাদের বাড়িতে বা শিশু-আশ্রমে আমার বয়সী জার্মান মেয়ে বিয়াত্রিস একদিন জানালো, আমরা নাকি এখন আর কেউ আমাদের বাবা মা’র সন্তান নই, আমরা আশ্রমের সন্তান, আশ্রমই আমাদের ভালো মন্দের দায়িত্ব নেবে।
তবে বাবা লণ্ডন যাওয়ার আগে মা’কে, আমাকে আর অলিভারকে জানিয়ে গিয়েছিলেন যে খুব জরুরি একটি কাজে তিনি যাচ্ছেন। ফিরে এসেও জানালেন যে তিনি তাঁর বাড়ি গাড়ি ফার্ম সব বিক্রি করে দিয়ে চিরতরে চলে এসেছেন। আমার ওই বয়সেই বুক কেঁপে উঠেছিলো শুনে। বই আর খেলনায়, পোস্টারে আর পেইন্টিংস-এ আমার সাজানো ঘরটি, আমার ইস্কুল, ইস্কুলের ভালো ভালো বন্ধু কাউকে আমি আর ফিরে পাবো না ভেবে হু হু করে কেঁদেছিলাম। আমার কান্নার দিকে বাবা মা ফিরে তাকাননি।
বাবা তাঁর সব টাকা রজনিশকে দান করে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে বাবা আরও বেশি বদলে গেলেন। আমাকে আর অলিভারকে দেখলে কেমন আছি জিজ্ঞেসও করেন না। কখনও যদি দেখেনও আমাদের, মনে হয় চিনতে পারছেন না। অন্য বাচ্চাদের দিকে যে চোখে তাকান, আমাদের দিকেও সে চোখে। মাঝে মাঝে সংশয় হয় মা বাবা দুজনেই ভুলে গেছেন যে আমরা তাঁদের সন্তান। আমাদের ইস্কুল, লেখাপড়া, ভবিষ্যত নিয়ে তাঁরা আর চিন্তিত নন। আমরা কী খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কী করছি তা একেবারেই জানতে চান না। শিশু-আশ্রমের অন্য শিশুদের একই অভিযোগ ছিল, ইউরোপ আমেরিকা থেকে তাদের বাবা মা’ও সমস্ত টাকাকড়ি এনে এখানে ঢেলেছেন, এই আশ্রমেই বাকি জীবন পার করবেন বলে পণ করেছেন। বড়রা, যাঁরা আমাদের দেখভাল করতেন, বলতেন রজনিশ ঈশ্বরের দূত, সে কারণেই সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে, আমরাও যেন তাঁকে শ্রদ্ধা করি। শ্রদ্ধা করার আমরা কোনও কারণ পেতাম না। আশ্রমে প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিস্কে অদ্ভুত সব পরিবর্তন ঘটেছিল নিশ্চিত, অপ্রাপ্তবয়স্করাই শুধু সুস্থ-মস্তিস্কে আলোচনা করতে পারতাম, অকুণ্ঠচিত্তে অন্যায়ের নিন্দে করতে পারতাম, অপরাধগুলোকে চিহ্নিত করতে পারতাম। মুশকিল হলো, অপ্রাপ্তবয়স্করা আশ্রমের ভেতরেই ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক হতে থাকে। তখন তাদের মস্তিস্কেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে।
ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে লাগলো আমার। চোখ কান খুলতে লাগলো। দেখতে লাগলাম বাবা অন্য মেয়েদের সঙ্গে উলঙ্গ শুয়ে আছেন, মা’কেও অন্য পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখি। যে বছর আমার ঋতুস্রাব হলো, সে বছর আমাকে ধ্যান-কক্ষে ঢোকানো হলো। আমাকেও ধ্যানে বসতে হবে, নাচতে হবে, আমাকেও পরাবাস্তবতায় বুঁদ হতে হবে, শরীরকে ঈশ্বর মানতে হবে, সুখের সরোবরে সাঁতরাতে হবে। ধ্যানের বিশাল কক্ষটিকে শিশু-আশ্রমে থাকাকালীন দূর থেকে বড় রহস্যময় মনে হতো।
দেখতাম নারী পুরুষ কক্ষে ঢুকছে, কক্ষ থেকে বেরোচ্ছে। কিন্তু কী হয় কক্ষে, তা শিশু আশ্রমের কেউ বলতে পারতো না। সব রহস্যের জট ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো। রজনিশের আদেশে ধীর লয়ে সঙ্গীত বাজে, সেই সঙ্গীতের তালে উলঙ্গ নর নারী নৃত্য করেন, নৃত্য করতে করতে একে অপরকে যৌনাঘাত করতে থাকেন, অতঃপর দলবদ্ধ যৌনসঙ্গমে তাঁরা লিপ্ত হন। সবার চোখের সামনে এই কর্মটি করতে কারও সংকোচ হয় না। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, যেন ধ্যান করছি, বেরিয়ে যাই কক্ষ থেকে। পরদিন আবারও ভেতরে ঢুকি। চোখের সামনে যৌনসঙ্গম দেখতে দেখতে, রজনিশের বিয়ে-বিরোধী, একসঙ্গী-বিরোধী, যার- সঙ্গে- ইচ্ছে-তার-সঙ্গেই যখন-ইচ্ছে-তখন চেনা-অচেনা-যে-কারও-সঙ্গে যৌনসঙ্গম করার অপার স্বাধীনতার পক্ষে বক্তব্য শুনতে শুনতে আমি খেয়াল করেছি আমি প্রভাবিত হচ্ছি। ধ্যান-কক্ষের ভেতর এক সময় আমাকেও হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় যুবকেরা, তারাও আমার শরীর স্পর্শ ক’রে আমার যৌনানুভূতি জাগ্রত করে। অচেনা অপরিচিত লোকের সঙ্গে আমার শরীরের সম্পর্ক হতে থাকে। আমার হাতে আসতে থাকে গাঁজা। আমি সপ্তম আকাশে ভাসতে থাকি।
বাবার নির্মিত বাড়িগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষ বাস করেন, তাঁদের সঙ্গে আমারও ঠাঁই হয়। অলিভার তখনও শিশু-আশ্রমে। আশ্রমের বড়দের সবারই কিছু না কিছু দায়িত্ব থাকে। তেরো বছর বয়স হলেও আমি বড়’র তালিকায়। শিশুদের খাওয়ানো পরানোর কাজ আমি ইচ্ছে করেই নিই। সব শিশুকে আমি সমান চোখে দেখি না, অলিভারের যত্ন একটু বেশিই নিই। বুঝি যে বাবা মা’র সন্তান হলেও আমি তাঁদের থেকে কিছুটা হলেও আলাদা। বাবা-মাকে যেমন ভুলে যাইনি আমি, ভাই অলিভারকেও ভুলে যাইনি।
এমন সময় একদিন শুনি রজনিশ ভারত ছেড়ে আমেরিকায় চলে যাবেন। ভারত সরকার তাঁর আশ্রমের ভেতর অনৈতিক কার্যকলাপ হচ্ছে অভিযোগ করে আশ্রম বন্ধ করে দিতে বলেছেন, প্রচুর টাকা করও বসিয়েছেন। তখনই রজনিশের একান্ত সচিব ওরফে বিশ্বস্ত শিষ্যা শীলা আমেরিকার অরেগনের বিস্তৃত এক খোলা জায়গায় রাজনিশপুরম গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেন। অধিকাংশ শিষ্য রজনিশের সঙ্গে অরেগন চলে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। অধিকাংশের মধ্যে আছেন আমার বাবা। কেউ কেউ নিজের অতীতে ফিরে যান, এই কেউ কেউ-এর দলে ছিলেন আমার মা। আমাকে আর অলিভারকে নিয়ে তিনি লন্ডনে ফিরে গেলেন। আমার সঙ্গে অলিভারের দূরত্ব তৈরি হয়নি, তবে আমার আর অলিভারের সঙ্গে যে বিস্তর দূরত্ব মায়ের, তা আমরা ভাই বোন দুজনই টের পাই। মা টের পান কিনা বুঝতে পারি না। তিনি থমথমে মুখে ভ্রমণ করলেন। নটিং হিলে ধনী-পিতার বাড়িতে উঠলেন। পিতার অর্থে আমাকে আর অলিভারকে বোর্ডিং ইস্কুলে পাঠিয়ে দিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তাঁর সম্পদ ব্যাংকে রেখে দিয়েছেন, যেখান থেকে আমার আর অলিভারের বোর্ডিং ইস্কুলের খরচ কেটে নেওয়া হয়। বয়সে বড় হয়ে বয়সে ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাকে ক্লাসে বসতে হলো। আশ্রমের অভিজ্ঞতা একবার যার হয়েছে, জাগতিক কোনও সমস্যাই তার কাছে সমস্যা বলে মনে হয় না। আমি পরীক্ষায় পাশ করে করে ঠিকই সেইসব ডিগ্রি নিয়ে নিলাম, যেগুলো নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে দরকার হয়। অলিভার ইস্কুলে পড়াকালীনই মাদকাসক্ত হয়ে ওভারডোজে মরে গেল। আমার সুন্দরী বিদুষী মা মানসিক হাসপাতালে কিছুকাল কাটিয়ে বাড়ি ফিরে এসে আত্মহত্যা করলেন।
পঁচাশি সালে একবার অরেগন গিয়েছিলাম বাবাকে দেখতে। অরেগনের রজনিশপুরমে পুনের আশ্রমের মতো ঘরবাড়ি বানিয়েছেন বাবা। জলের ব্যবস্থা, বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। চৌষট্টি হাজার একরের ধুসর জমিতে নিজের হাতে ছোট একটি শহর বানিয়ে ফেলা, চাট্টিখানি কথা নয়। বাবা অবশ্য একা সব করেননি, বাবার মতো প্রকৌশলী বেশ কিছু আছেন আশ্রমে। আশ্রমে ডাক্তার বৈদ্যও আছেন। আইনবিশারদ আছেন। রাজনীতিক আছেন, রাঁধুনি আছেন, দরজি আছেন। আশ্রম এভাবেই স্বয়ং সম্পূর্ণ। দক্ষ লোক ডাকতে বাইরে যাওয়ার দরকার পড়ে না। লক্ষ্য করি মা’র সঙ্গে আমার যতটা দূরত্ব ছিল, তার চেয়ে দ্বিগুণ দূরত্ব বাবার সঙ্গে। এতকাল পরে দেখা হয়েছে, অথচ মুখোমুখি বসে থাকি, বলার মতো আমাদের কিছু কথা থাকে না। আশ্রমের যে কোনও একটি লোকের মতো বাবা, যে কোনও মাইকেল স্মিথ। মা আত্মহত্যা করেছেন শুনে বাবার মুখে কোনও কষ্ট ফুটতে দেখলাম না। অলিভার ওভারডোজে মারা গেছে শুনেও বাবা নির্বিকার। তাঁর মন প্রাণ রজনিশে। রজনিশপুরমের খাবার খেয়ে খেয়ে বাবার স্বাস্থ্যও ভেঙে গেছে, ওজন কমে অর্ধেক। কৃশকায় একটি লোক যিনি এককালে ভীষণ প্রতিভাবান এবং প্রভাবশালী ছিলেন, ইম্পেরিয়াম ইঞ্জিনিয়ারং গড়ে তুলেছিলেন একা হাতে, সেই মানুষ এখন ভুল উচ্চারণে ইংরেজি বলা, হাতে অরুচিকর হীরে বসানো ঘড়ি পরা এক ভারতীয় লোকের দাসে পরিণত হয়েছেন। বাবাকে লন্ডন ফিরে যেতে বলি। নতুন করে ফার্ম গড়ে না তুললেও অন্তত কোনও ফার্মে চাকরি তো পাবেন! বাবার একটিই উত্তর, না। আমি অনুভব করি আমার জন্য বাবার কোনও ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। শুধু টাকা পয়সা নয়,তাঁর সব ভালোবাসাও রজনিশের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন। আমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি লণ্ডনে। দেখে আসি রজনিশপুরমে শিষ্যা শীলা কী করে ছড়ি ঘুরিয়ে আশ্রমবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করেন, দেখে আসি রজনিশের অঢেল হীরে জহরত, পঁচাশিটি রোলস রয়েস গাড়ি। না, কিছুই তাঁর উপার্জন নয়, সবই শিষ্যদের দান। রজনিশপুরম জগতের বাইরে একটি ভিন্ন জগত। সকলে মেরুন রঙের কাপড় পরে ঘোরের মধ্যে চলাফেরা করছেন, রজনিশের আদেশ উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন। আগে বলা হতো রজনিশ বুঝি ঈশ্বরের দূত, অরিগনে শুনে এলাম, তিনিই স্বয়ং ঈশ্বর। ঈশ্বরটির দেখা আমি পাইনি। বাবাই বললেন, ভগবান কয়েক বছর ধ্যান করবেন, ঘর থেকে বেরোবেন না।
ভগবান রজনিশের এক ফুঁয়ে আমাদের সুখের সংসার ভেঙে গেছে। মা’কে আর ভাইকে হারিয়েছি। বাবাকেও হারিয়েছি। ওদিকে রজনিশের বিরুদ্ধে আমেরিকায় মামলা হয়েছে। জেলও খেটেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আমেরিকা থেকে বের করে দিয়েছে আমেরিকার সরকার। কোনও সভ্য দেশেই তাঁকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি। খাবারে বিষ মিশিয়ে সাতশ’ লোককে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করার দায়ে শিষ্যা শীলাকেও জেলে পোরা হয়েছে। অরেগনের রজনিশপুরমের দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিষ্যরা যে যাঁর পথে চলে গেছেন। সর্বস্ব দান করে যাঁরা সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। বাবার খোঁজ নিতে চেষ্টা করেও পাইনি। বছর দুই পর এক পরিচিত আমেরিকান শিষ্যর কাছে শুনেছি বাবা নাকি এক আমেরিকান মহিলার সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। সেই মহিলার নাম ঠিকানা শিষ্য দিতে পারেননি। বাবার আত্মীয় স্বজন যাঁদের অনেকে লিভারপুলে থাকেন, বাবার খবর জানতে মোটেও আগ্রহী নন। আমি বেঁচে আছি, আমি ইস্কুল কলেজে পড়েছি, শিক্ষকতার চাকরি করছি, কয়েক বছর পর পর এসব তথ্য দিয়েছিলাম। তাঁদের পক্ষ থেকে সামান্য অভিনন্দনও জোটেনি আমার। তাঁদের বিশ্বাস যারা রজনিশের আশ্রমে থেকেছে, তাদের নৈতিকতা বলতে কিছু নেই আর, তারা সভ্য সমাজে বাস করার উপযুক্ত নয়। আমার মায়ের আত্মীয়দের সঙ্গে কদাচিৎ কথা হয়। সেও অনেকটা কথা না-হওয়ার মতোই। আমি আমার জীবন নিয়ে একা হয়ে যাই।
যৌবনে দেখা পেয়েছি বেশ কিছু যুবকের। কাছে এসেছিল, বলেছিল ভালোবাসি। তাদের কাউকে কাউকে আমি ভালোবেসেছি, কিন্তু কাউকেই নিবিড় করে পেয়ে আমার তৃপ্তি হয়নি। কেবলই মনে হয়েছে কী যেন নেই, কিছুর যেন অভাব। আমাকে হয়তো পুনের আশ্রমই এরকম বানিয়েছে। আমার যৌনতার হাতেখড়ি যে পরিবেশে হয়েছিল, আমার অবচেতন মন বারবার সেই পরিবেশটিই চেয়েছে। মৃদু সঙ্গীতের সঙ্গে নাচবো, একই সঙ্গে কয়েকটি পুরুষ আমার যৌনতাকে জাগিয়ে তুলবে, আমি তাদের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবো, সর্বসুখ দেবো এবং নেবো। উপলব্ধি করবো শরীরই শক্তি, শরীরই স্বর্গ। পুনের আশ্রমে তিনটে বছর কারা আমাকে যৌনানন্দ দিয়েছিল, তাদের নামও আর আমার মনে নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের স্পর্শ ছাড়া আমি বোধ হয় কোনওদিন আর তৃপ্ত হবো না। ওদের হাতে জাদু ছিল। যখন আমি পনেরো, রজনিশ আমাকে তাঁর ঘরে একবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমাকে তিনি রক্তিম দ্রাক্ষারস পান করিয়েছিলেন, কী মিশিয়েছিলেন ওতে আমি জানিনা। সেদিন তাঁর ঘরে আলোর মতো অন্ধকারে আমার শরীর নিয়ে দীর্ঘক্ষণ খেলেছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে তিনি খেলছেন। আশ্রমের সেই রাতটিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত ছিল। আমার মনে হয়নি আমি এই জগতের কোথাও আছি, মনে হয়েছিল যেখানেই আছি, সেটি স্বর্গ না হয়ে যায় না।
রজনিশ আমাকে পুরো অচেতন করতে পারেননি সে-রাতে। অর্ধচেতন অবস্থায় তাঁর ঘর থেকে ভোরবেলায় বেরিয়ে মা’কে দেখতে পেয়েছিলাম উঠোনে। তিনি বিস্মিত চোখে আমাকে দেখছিলেন। সেদিন যদি মা আমাকে না দেখতেন, তাহলে হয়তো তিনি পুনের আশ্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের নিয়ে লন্ডনে ফিরতেন না, অরিগনে পাড়ি দিতেন।
রজনিশের দেওয়া দেবিকা নামটিই আমার নাম হিসেবে খাতা কলমে রয়ে গিয়েছে। অলিভারের নাম বদলে রূপম করা হয়েছিল। জানিনা রজনিশের প্রতি না- ফুরোনো আকর্ষণ বা কৃতজ্ঞতার কারণেই কি না মা এই নামদুটো আমাদের ইস্কুলের রেজিস্ট্রি খাতায় বসিয়েছিলেন! দেবিকা স্মিথ, রূপম স্মিথ। রজনিশের জন্য এতই যদি তাঁর আবেগ, তিনি কেন আশ্রম ছেড়ে এলেন? আমাকে ওই পরিবেশ থেকে দূরে সরাতে? এই প্রশ্নটি আমার ভেতরে রয়ে গেছে, এটির উত্তর আমি আজও জানি না। মা বেঁচে থাকলে তাঁকে প্রশ্নটি করতে পারতাম।
ইংলেন্ডের বিভিন্ন কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে মাঝে অতিথি বক্তা হিসেবে সত্তরের দশকে ভারতীয় গুরুর আশ্রমে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, ভালো কিছু সম্মানী জোটে এর ফলে । অনেকের ধারণা আছে এ বিষয়ে। কেউ কেউ তো বিশেষজ্ঞও। কিন্তু যাঁরা সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, অর্থাৎ আশ্রমে বাস করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে শোনা, অনেকে বলেন, বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি বর্ণনা করি কীভাবে আমাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে রজনিশের কারণে, কীভাবে তাঁর সম্মোহনি শক্তি হাজারো মানুষকে বছরের পর বছর ঘোরের ভেতর রেখেছে, অন্ধ-বধির করে রেখেছে,যুক্তিবুদ্ধিহীন করে রেখেছে, আমাকে কিশোরী অবস্থায় যৌনতার পাঠ দেওয়া হয়েছে, এবং তখন না বুঝলেও এখন বুঝি আমাকে ধর্ষণ করেছিলেন স্বয়ং রজনিশ এবং তাঁর কিছু শিষ্য। প্রতিবারই বক্তৃতা করার পর আমি বাড়ি ফিরে সারারাত ছটফট করি। ঘুমোতে পারি না। নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি শতভাগ সত্য বলেছি, নাকি লোকে যা পছন্দ করে শুনতে তা বলেছি!
একদিন ঠিক বাবার মতোই আমি হুট করে লন্ডন থেকে বোম্বে যাওয়ার টিকিট কাটি। কেউ যেন না জানে, পরিচিত কেউ যেন না দেখে এমন ভাবে টিকিটটি নিয়ে বিমান বন্দরে যাই। হিথরো থেকে শিবাজি মহারাজ। বাবা যেভাবে বোম্বে থেকে পুনে গিয়েছিলেন গাড়িতে, সেভাবে পুনে যাই। নব্বই সালে রজনিশের মৃত্যুর পর আশ্রম নতুন করে চালু হয়েছে। দায়িত্ব এখন ট্রাস্টি বোর্ডের। সুইৎজারল্যাণ্ডের জুরিখে বোর্ডের অফিস। ট্রাস্টি বোর্ডের কাছে রজনিশের লক্ষ -কোটি টাকা। আশ্রমের নাম বদলে রাখা হয়েছে অশো ইন্টারন্যাশনাল মেডিটেশান রিসোর্ট। আশ্রমের বন বাদাড় হয়ে উঠেছে সুসজ্জিত বাগান। বাবার বানানো পুরোনো ঘরবাড়ির দুটো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িগুলোর কোথাও নির্মাতা মাইকেল স্মিথের নাম লেখা নেই। স্থপতি ডেবোরা স্মিথের নামও নেই। ওসবের দেয়াল স্পর্শ করে আমি বাবা মা’র অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করি। মাটিতে আমার আর অলিভারের খালি পায়ের দাগ খোঁজার চেষ্টা করি। কিছু নেই, কিন্তু চোখ বুঝলেই দেখি আছে। আশ্রম এখন আগের চেয়ে বেশি পরিপাটি, বেশি পাঁচতারা, বেশি আধুনিক এবং বেশি নিয়ন্ত্রিত। অতিথিশালা,রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, লাইব্রেরি, সুইমিং পুল,সৌনা, স্পা, জাকুজি, টেনিস কোর্ট, অডিটোরিয়াম, কী নেই! অতিথিশালায় একখানা আলোয় ঝলমল ঘর নিই আমি। সুইমিং পুলে সাঁতার কাটি। স্নান সেরে গায়ে মেরুন রঙের গাউন চড়িয়ে অডিটোরিয়ামে ঢুকি। ধ্যান করার জন্য আগে যে বুদ্ধ হল ছিল, সেটির বদলে উঠেছে অডিটোরিয়াম। সকাল থেকে এটি খোলা। যখন যাঁর ইচ্ছে আসছেন। নারী পুরুষ সঙ্গীতের তালে আলো-আঁধারে শরীর দোলাচ্ছেন। আমিও আর সবার মতো শরীর দোলাই। লক্ষ করি কেউ উলঙ্গ হচ্ছেন না। কেউ সঙ্গমকে আধ্যাত্মিকতা ভেবে স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করতে চাইছেন না। উলঙ্গ না হলেও যাঁরা আমার নাগালের মধ্যেই নাচছেন, তাঁদের সঙ্গে চোখে চোখে কথা হয়ে যায়। অডিটোরিয়াম থেকে বাগানে যান জার্মান যুবকেরা, সঙ্গে আমি । ওঁরা গাঁজায় সুখটান দেন। ওঁদের গাঁজার ধোঁয়া আমার কৈশোরকে এক টানে ফিরিয়ে আনে। আমিও প্রাণ ভরে ধোঁয়া নিই। কেউ অনর্গল কথা বলতে থাকেন, কেউ চুপ হয়ে থাকেন। আমি শুধু বলি, ‘আজ রাতে ওর্জিতে কারা রাজি, চলে এসো তেরো নম্বরে’। আমার চেয়ে বয়সে ছোট ওঁরা। কিন্তু প্রত্যেকে লাফিয়ে ওঠেন। কোনও অনাগ্রহ নেই যৌনতায়। রজনিশ নেই, রজনিশের আদর্শ পড়ে আছে।
সারারাত দলবদ্ধ যৌনতার আনন্দ নিই। শরীর নামক বাহনে চড়ে শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসি। রজনিশ তো তা-ই করতে বলতেন। রজনিশের ওপর রাগ আমার, লোকটি আপাদমস্তক ভন্ড ছিলেন, চতুর ছিলেন, লোভী ছিলেন, কিন্তু লোকটির ওপর আবার কৃতজ্ঞতাও আমার কম নয়। মানুষকে যৌনতার ব্যাপারে সংস্কারমুক্ত করেছিলেন তিনি। বিবাহহীন বন্ধনহীন মুক্ত-যৌনতাসমৃদ্ধ জীবনের কথা বলে গেছেন, যে জীবনের প্রতি এক অস্পষ্ট আকর্ষণ খুব গোছানো জীবন যাপন করা সুশীল মানুষের ভেতরেও খুব গোপনে লুকিয়ে থাকে। অবশ্য এটি তখন কোনও নতুন কথা ছিল না। হিপি আন্দোলনের লোকেরা একই কথা বলেছেন। হিপিরা হারিয়ে গেছেন, রজনিশের শিষ্যরা এখনও সবাই হারিয়ে যাননি। রজনিশের অপরাধ সর্বত্র প্রমাণিত, তিনি ঘৃণিত, নিন্দিত, কিন্তু তাঁকে কুর্ণিশ করার লোক আজও সব মরে যাননি। আজ অনেকটা বয়স পেরিয়ে এসে আমি দেখি তাঁকে ঘৃণা করলেও তাঁকে ভালোবাসি। ঠিক আমার মায়ের মতো। ঘৃণা করে তিনি আশ্রম ছেড়েছিলেন, কিন্তু ভালোবেসে তাঁর দেওয়া নামগুলো তাঁর সন্তানদের জন্য রেখেছিলেন। আমি রজনিশের কীর্তিকলাপের নিন্দে করে বক্তৃতা দিই বটে, কিন্তু যৌনতার সত্যিকার স্বাদ নিতে চাইলে অন্য কোথাও নয়, তাঁর আশ্রমের শরণাপন্ন আমাকে হতেই হয়।
আশ্রম ত্যাগ করার আগে মনে মনে আকাশ বাতাস, গাছগাছালি, পাখপাখালি, বাবার বানানো বাড়িগুলো, আর পিরামিডের মতো দেখতে অডিটোরিয়ামটিকে মনে মনে বলে যাই, ‘আবার আসিব ফিরে’। ”
তসলিমা নাসরিনের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Translate »